২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, তেহরিক-ই‑তালিবান পাকিস্তান (TTP)–র সঙ্গে লড়াইয়ে যোগ দিয়ে মারা গেছেন ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশের যুবক ফয়সাল হোসেন। প্রতি পরিবারকে আগে বলা হয় যে সে “দুবাই তে কাজ” করতে যাবে; কিন্তু বাস্তবে সে পাকিস্তানে যোগ দেয়।
একই বছর এপ্রিল মাসে আরেক বাংলাদেশি যুবক যুবায়ের আহমেদ উমরাহ শেষে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সেও নিহত হয়।
পাকিস্তানের সনামধন্য পত্রিকা Dawn-এর তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪ জন বাংলাদেশি নিশ্চিতভাবে নিহত হয়েছে, যারা পাকিস্তানে TTP বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলো।
বাংলাদেশের কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্র্যান্সন্যাশনল ক্রাইম ইউনিট (CTTC)–র মতে, বর্তমানে ২৫–৩০ জন বাংলাদেশি পাকিস্তানে রয়েছে এবং সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে লড়াই করছে।
এছাড়া, বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী “গত কয়েক বছরে” কমপক্ষে ১০০ জন বা তার বেশি এমন ব্যক্তি চিহ্নিত হয়েছে যাদের উদ্দেশ্য পাকিস্তানে যাওয়ার। এর অনেককেই আইনগতভাবে যাওয়া আটকানো হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান
| নিশ্চিত নিহত বাংলাদেশি | কমপক্ষে ৪ জন |
| বর্তমানে সক্রিয় (অনুসন্ধানে) পাকিস্তানে বাংলাদেশি | প্রায় ২৫–৩০ জন |
| চলতি বা পরিকল্পনাময় বিদেশ যাত্রা — যারা আটক বা শনাক্ত হয়েছে | ~১০০ জন বা তার বেশি (চেষ্টা শনাক্ত) |
মূল কারণ ও ঝুঁকি — কেন বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন হয়ে যাচ্ছে জঙ্গি
অধিকাংশ আক্রান্ত যুবকরা “নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত” পটভূমি থেকে; তারা অর্থনৈতিক প্রলোভন বা বিদেশে কাজের প্রতিশ্রুতি পেয়ে সহজেই রিক্রুট হয়েছে।
গোপন রিক্রুটমেন্ট — অনলাইন এবং সামাজিক মিডিয়া চ্যানেল বা অপ্রচলিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে “চাকরি/উচ্চ আয়/উন্নতি” নামে প্রলোভন দেখিয়ে নেয়া হয়েছে যার আসল উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গি গোষ্ঠীতে নাম লেখানো।
আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক সচেতনতা এবং গমন গন্তব্য-নিয়ন্ত্রণ — যেখানে পর্যাপ্ত নয়; ফলে রূপায়ণ সহজ হয়েছে।
এই প্রবাহ কেন এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে
বাংলাদেশে অপ্রচলিত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর রিক্রুটমেন্ট কৌশল পরিবর্তন করেছে। তারা এখন “বিদেশি চাকরি/উন্নতি” প্রলোভন দেখিয়ে গোপন নেটওয়ার্ক + অনলাইন প্রচারণা ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকরা বলেন, ২০২৩ সাল থেকে এই “পাইপলাইন” স্পষ্ট দেখা দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাংলাদেশে অন্তত ১০০ জনকে সনাক্ত ও প্রতিহত করেছে, যারা প্রাকগমন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলো।
ঝুঁকি
এই ডেটা–ভিত্তিক চিত্র দেখায় যে — এটি এখন কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। প্রায় ২৫–৩০ জন সক্রিয় সদস্য, নিশ্চিত নিহত, আটক/প্রচেষ্টাকারী ১০০ জনের তথ্য মিলিয়ে — বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে গিয়ে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার চিত্র স্পষ্ট।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতা, গোপন রিক্রুটমেন্ট ও অনলাইন আন্দোলনের মাধ্যমে — “নেটওয়ার্ক পুঁজি” তৈরি হয়ে গেছে। এটি শুধু আইনগত বা নিরাপত্তার সমস্যা নয়, সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুব সম্প্রদায়, পরিবার, কমিউনিটিতে সন্ত্রাস-চিন্তার রূপায়ণ।
কীভাবে মোকাবিলা করা যায়
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু “গ্রেফতার ও দমন” নয় — প্রিভেন্টিভ (প্রতিরোধমূলক) মনোভাব নিতে হবে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী, ভিসা/ভ্রমণ যাচাই, অনলাইন রিক্রুটমেন্ট চ্যানেলের নজরদারি বাড়াতে হবে।
সমাজ এবং পরিবার ভিত্তিক সচেতনতা বাড়াতে হবে: যারা কাজ/উন্নতির নামে বিদেশ যেতে চায়, তাদের প্রতিবেশী, পরিবার ও কমিউনিটিকে সচেতন করে তুলতে হবে।
যুবকদের জন্য বৈধ, নিরাপদ ও প্রতিশ্রুতিশীল কর্মসংস্থান ও সুযোগ তৈরি করতে হবে — যাতে তারা বিদেশি প্রলোভনের দিকে না ঝুঁকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কাজ করে — মতবিরোধ, গুমরাহ ও প্রলোভন সম্পর্কে সচেতনতা গড়তে হবে।
Dawn এর ওই রিপোর্ট এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্ট দেখায়: বাংলাদেশ এখন শুধু অভ্যন্তরীণ জঙ্গিবাদের মুখে নয় — একটি “মিলিট্যান্ট এক্সপোর্টার” হিসেবে রূপ নিয়েছে।
যদি সময়মতো — প্রতিরোধ, সামাজিক সচেতনতা, ও যৌক্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ না করা যায় — তাহলে এই “পাইপলাইন” ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
সূত্রঃ Dawn








Leave a Reply